প্রকাশিত: ৫৪ মিনিট আগে, ১০:২৯ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ত্যাগ করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে তাঁর বিদায়ের সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে আসেনি। এর আগে টানা কয়েক দিন ধরে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন স্তরে দ্রুত বদলে যেতে থাকে পরিস্থিতি। নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ আলোচনা, মাঠের বাস্তবতা এবং সামরিক নেতৃত্বের মূল্যায়ন—সবকিছু মিলিয়ে ঘণ্টায় ঘণ্টায় পাল্টে যায় সিদ্ধান্তের হিসাব। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট সকালে সামরিক নেতৃত্বের মূল্যায়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং ঢাকামুখী জনস্রোতের প্রেক্ষাপটে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন ক্রমেই গণআন্দোলনের রূপ নেয়। শুরুতে আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ। কিন্তু আন্দোলন দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান, বলপ্রয়োগ, গুলিবর্ষণ এবং প্রাণহানির ঘটনায় পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হতে থাকেন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিনই বিক্ষোভ বাড়তে থাকে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরেও উদ্বেগ তৈরি হয়।
পরিস্থিতির এমন প্রেক্ষাপটে ৩ আগস্ট সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনা সদরে কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বিশেষ দরবারে বসেন। বৈঠকে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সেনাবাহিনীর করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকে বহু কর্মকর্তা স্পষ্টভাবে মত দেন যে, বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা উচিত হবে না। তাদের বক্তব্য ছিল, সেনাবাহিনীর অস্ত্র যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য; সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে তা ব্যবহার করলে ভয়াবহ প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং রাজপথে সেনাবাহিনীকে দেশের সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখার আহ্বানও বাড়তে থাকে। অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তাও প্রকাশ্যে আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, ওই দরবারের পর থেকেই রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। সরকারের ভেতরেও এই বার্তা পৌঁছে যায় যে, সেনাবাহিনী জনগণের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালাতে আগ্রহী নয়।
৩ আগস্টের বৈঠকের পরও সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার শেষ চেষ্টা চালায়। ৪ আগস্ট দিনভর এবং গভীর রাত পর্যন্ত গণভবনে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সরকারের মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা।
সূত্রগুলোর দাবি, বৈঠকে জরুরি অবস্থা জারি, আন্দোলন আরও কঠোরভাবে দমন, রাজনৈতিক সমঝোতা কিংবা প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ—বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়। তবে কোনো সিদ্ধান্তেই ঐকমত্য তৈরি হয়নি। এদিকে রাজপথে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হতে থাকে। রাজধানীমুখী মানুষের ঢল এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ায় সরকারের উদ্বেগ বাড়তে থাকে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ৪ আগস্ট রাতে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান গণভবনে গিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। বৈঠকে শেখ রেহানাও উপস্থিত ছিলেন বলে সূত্রগুলোর দাবি।
সূত্রগুলোর ভাষ্য, সেনাপ্রধান তখন শেখ হাসিনাকে জানান যে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ এবং দ্রুত রাজনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার পরামর্শ দেন এবং সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে বলে সতর্ক করেন।
৫ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে শেখ হাসিনা আবার সেনাপ্রধানকে গণভবনে ডাকেন। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, তখন তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন এবং তাঁর হাতে নিজের লেখা পদত্যাগপত্র ছিল।
সেনাপ্রধান বিষয়টি জানার পর সেনা সদরে ফিরে যান। সম্ভাব্য অরাজকতা এড়াতে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেন। সেনা সদর-ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, ভোরেই ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন মহাপরিচালককে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে সেনা সদরে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলার বিষয়ে আলোচনা হয়।
গণভবন-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও শেখ হাসিনা প্রথমে কোথায় যাবেন, সে বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল না। পরে তিনি ভারত সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
২০২৪ সালের ৬ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর রাজ্যসভায় দেওয়া বক্তব্যে বলেন, শেখ হাসিনা খুব অল্প সময়ের নোটিশে ভারতে সাময়িকভাবে আশ্রয়ের অনুমতি চেয়েছিলেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ তাঁর বহনকারী বিমানের জন্য উড্ডয়ন ছাড়পত্রের অনুরোধ করেছিল। পরদিন ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও এ তথ্য প্রকাশিত হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকটি বিষয় দ্রুত পরিস্থিতি বদলে দেয়। এর মধ্যে ছিল—
এসব কারণ মিলিয়ে ৫ আগস্ট সকালে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে সরকারের পক্ষে ক্ষমতায় টিকে থাকা আর সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মূল্যায়ন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। টানা এক মাসের আন্দোলন, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবর্তিত বাস্তবতা এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার পরিবর্তন—সবকিছুই দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
তবে ৩ থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে গণভবন, সেনা সদর ও বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থায় কী কী আলোচনা হয়েছিল, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ কোনো সরকারি নথি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ওই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া যায়, তার বড় অংশই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বর্ণনা, বিভিন্ন সূত্রের তথ্য এবং তৎকালীন প্রকাশিত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে উঠে এসেছে।
মন্তব্য করুন