প্রকাশিত: ৫ জুলাই, ২০২৬, ০৭:৫৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
কনস্টেবল হওয়ার স্বপ্ন ছাপিয়ে ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে দেশসেরা কেশবপুরের বাচ্চু রহমান
আলী হামজা, কেশবপুর (যশোর) প্রতিনিধি:
ছোটবেলায় স্বপ্ন ছিল পুলিশের কনস্টেবল হওয়ার। কারণ, বাবা ছিলেন আনসার সদস্য। বাবার ইউনিফর্ম, বুট আর বেল্ট নিয়েই খেলতে খেলতে বড় হয়েছেন বাচ্চু রহমান। সেই শৈশবের স্বপ্নই একসময় তাকে বড় লক্ষ্য স্থির করতে অনুপ্রাণিত করে। কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করে তিনি শুধু স্বপ্ন পূরণই করেননি, তা ছাড়িয়েও গেছেন। ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে পুলিশ ক্যাডারে প্রথম স্থান অর্জন করে দেশসেরা হয়েছেন যশোরের কেশবপুর উপজেলার কানাইডাঙ্গা গ্রামের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান বাচ্চু রহমান।
তার এ অসাধারণ সাফল্যে আনন্দে ভাসছে পরিবার। বাবা-মায়ের চোখে আনন্দাশ্রু, আর পুরো কানাইডাঙ্গা গ্রামজুড়ে বইছে উৎসবের আমেজ।
তবে বাচ্চু রহমানের সাফল্যের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। ৪৫তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি তিনি। সেই ব্যর্থতাকে শক্তিতে পরিণত করে নতুন উদ্যমে শুরু করেন প্রস্তুতি। এরপর ৪৯তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। সর্বশেষ গত ২৮ জুন প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে নিজের কাঙ্ক্ষিত পুলিশ ক্যাডারে প্রথম স্থান অর্জন করে সবার নজর কাড়েন।
বাচ্চু রহমান কেশবপুর উপজেলার কানাইডাঙ্গা গ্রামের আনসার সদস্য নজরুল ইসলাম ও গৃহিণী বিলকিস বেগম দম্পতির দুই সন্তানের মধ্যে ছোট। সীমিত আয়ের সংসারে দুই সন্তানের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা ছিল পরিবারের জন্য কঠিন সংগ্রামের বিষয়।
বাচ্চুর মা বিলকিস বেগম বলেন, “অনেক অভাব-অনটনের মধ্যেও ওর বাবা ছেলেদের লেখাপড়া করিয়েছেন। চাকরির প্রায় সব টাকাই চলে যেত তাদের পড়াশোনার পেছনে। ছোটবেলায় বাচ্চু পড়াশোনায় খুব মনোযোগী ছিল না। তবে জেএসসি পরীক্ষার পর স্কুলের পিকনিক থেকে ফিরে হঠাৎই পড়াশোনার প্রতি তার গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর দিন-রাত বই নিয়েই থাকত। অনেক সময় জোর করে বই সরিয়ে নিতে হতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও অনেক কষ্ট করেছে। আজ সৃষ্টিকর্তা তার সেই পরিশ্রমের প্রতিদান দিয়েছেন।”
বাচ্চু রহমান ২০১৫ সালে কানাইডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। ২০১৭ সালে স্থানীয় পাঁজিয়া মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করে ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হন।
বিসিএস প্রস্তুতিতে তিনি প্রথাগত মুখস্থনির্ভর পদ্ধতির বদলে বিষয়ভিত্তিক বিশ্লেষণকে গুরুত্ব দেন। কমার্স বিভাগের শিক্ষার্থী হওয়ায় প্রতিটি বিষয় কেন ঘটছে এবং তার সমাধান কী—তা গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করতেন। বিসিএসের গৎবাঁধা গাইডের বাইরে নিয়মিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পত্রিকা পড়ার অভ্যাস তাকে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে রেখেছে।
লক্ষ্য একজন সৎ, দক্ষ ও মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা হওয়া
নিজের অনুভূতি জানাতে বাচ্চু রহমান বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরই জানতে পারি, বিসিএসের মাধ্যমে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হওয়া যায়। তখনই সিদ্ধান্ত নিই, আমি পুলিশ ক্যাডারেই কাজ করব। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, মাদক ও সাইবার অপরাধের নানা ঘটনা আমাকে নাড়া দিত। তখন থেকেই এসব অপরাধ প্রতিরোধে কাজ করার প্রবল ইচ্ছা তৈরি হয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমি শুধু পদমর্যাদার কর্মকর্তা হতে চাই না। একজন সৎ, দক্ষ ও মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই। মানুষ বিপদে পড়লে সবচেয়ে বেশি ভরসা করে পুলিশ ও চিকিৎসকের ওপর। আমি এমনভাবে দায়িত্ব পালন করতে চাই, যাতে সাধারণ মানুষের পুলিশের প্রতি আস্থা আরও দৃঢ় হয়।”
কানাইডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুস সবুর বলেন, “ব্যর্থতাকে জয় করে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা বাচ্চু রহমানের এই অর্জন কেশবপুরবাসীর জন্য গর্বের। ছোটবেলা থেকেই সে ছিল অত্যন্ত বিনয়ী, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও পরিশ্রমী। তার সাফল্য প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা, ধৈর্য ও নিরলস পরিশ্রম থাকলে যেকোনো বড় স্বপ্নই বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব। দেশের লাখো চাকরিপ্রত্যাশী তরুণের জন্য বাচ্চু রহমান আজ অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মন্তব্য করুন