প্রকাশিত: ৩ ঘন্টা আগে, ০২:০৩ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র কষাঘাতে আজ বিপর্যস্ত পুরো বিশ্ব, যার অন্যতম প্রধান ও নির্মম ভুক্তভোগী আমাদের এই অপরূপ বাংলাদেশ। গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স বা বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে দীর্ঘমেয়াদে শীর্ষ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় ওপরের দিকেই রয়েছে বাংলাদেশের নাম। অসময়ে তীব্র দাবদাহ, অনাবৃষ্টি, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাওয়া, আবার পরক্ষণেই অতিবৃষ্টি কিংবা বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়—প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ আমাদের প্রতিনিয়ত সতর্কবার্তা দিচ্ছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, এই মহাবিপর্যয় থেকে বাঁচতে এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য ভূখণ্ড রেখে যেতে প্রকৃতির সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক হলো ‘বৃক্ষ’। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই, আর চারা রোপণের জন্য এই বর্ষাকালই হলো বছরের সবচেয়ে সুবর্ণ সময়।
একটি দেশের পরিবেশ ও আবহাওয়ার স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখতে মোট ভূখণ্ডের অন্তত ২৫ শতাংশ বনাঞ্চল থাকা আবশ্যক। কিন্তু সরকারি হিসাবমতে আমাদের মোট বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকা প্রায় ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশ হলেও, প্রকৃত বনাঞ্চলের পরিমাণ বা ঘন বনাঞ্চল অনেক কম। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বন উজাড়ের হার বৈশ্বিক গড় হারের চেয়ে অনেক বেশি। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং আবাসন প্রকল্প গড়তে গিয়ে প্রতিনিয়ত নির্বিচারে কাটা হচ্ছে শতবর্ষী গাছপালা ও বনভূমি। এই আত্মঘাতী এবং অবিবেচকের মতো আচরণের সরাসরি মাশুল দিচ্ছি আমরা। গ্রীষ্মকালে দেশের তাপমাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ৪২-৪৩ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা আমাদের জনজীবন ও অর্থনীতিকে স্থবির করে তুলছে।
গাছ কেবল আমাদের বিনামূল্যে বেঁচে থাকার অক্সিজেন দেয় না, তা বাতাসের বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড ও ক্ষতিকর পার্টিকুলেট ম্যাটার (ধূলিকণা) শুষে নিয়ে ছাতার মতো আমাদের রক্ষা করে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। একটি পূর্ণাঙ্গ গাছ বছরে প্রায় ৪৮ পাউন্ড কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডল থেকে শোষণ করতে পারে। এছাড়া, মাটির ক্ষয় রোধে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধরে রাখতে গাছের মূল বা শিকড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের গতিবেগ কমিয়ে দিতে সুন্দরবনসহ আমাদের উপকূলীয় বনাঞ্চল বুক পেতে দেয়। বনাঞ্চল ধ্বংসের অর্থ হলো এই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যুহকে নিজ হাতে ভেঙে ফেলা।
আষাঢ়-শ্রাবণ তথা এই বর্ষাকালকে বলা হয় বৃক্ষরোপণের শ্রেষ্ঠ ঋতু। এ সময় প্রকৃতিজুড়ে থাকে বৃষ্টির আবহ। নিয়মিত বৃষ্টির কারণে মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকে, যা নতুন রোপণ করা চারার শিকড়কে মাটির গভীরে সহজে ছড়িয়ে যেতে সাহায্য করে। বর্ষার মেঘলা আকাশ ও সহনীয় তাপমাত্রা তরুণ চারা গাছকে তীব্র রোদের উত্তাপ ও ‘ওয়াটার স্ট্রেস’ থেকে বাঁচায়, ফলে চারা মারা যাওয়ার হার প্রায় শূন্যে নেমে আসে। প্রকৃতি নিজেই এ সময় গাছের প্রাকৃতিক সেচের দায়িত্ব নেয়। ফলে কৃত্রিম যত্নের ওপর নির্ভরতা কমে এবং চারা গাছ খুব দ্রুত স্বাবলম্বী হয়ে বেড়ে ওঠার শক্তি পায়।
তবে লক্ষ্যহীনভাবে গাছ লাগালেই এই সংকটের সমাধান হবে না; এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা। আমাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে দেশীয় ফলদ, বনজ ও ওষধি গাছের চারা রোপণে। বিদেশি ইউক্যালিপটাস বা আকাশমণির মতো গাছ মাটির উর্বরতা ও পানির স্তর কমিয়ে দেয়, যা আমাদের বাস্তুতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। বাড়ির চারপাশ, ছাদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণ, সড়কের পাশে এবং নদীর তীরবর্তী পতিত জমিতে স্থানভেদে সঠিক জাতের চারা নির্বাচন করতে হবে। পাশাপাশি, বর্ষায় পানি নিষ্কাশনের সঠিক ব্যবস্থা রাখা জরুরি, কারণ অতিরিক্ত জলাবদ্ধতায় চারার গোড়া পচে যেতে পারে। চারা রোপণের পর অন্তত প্রথম কয়েকটি মাস গবাদি পশুর হাত থেকে বাঁচাতে বেড়া দেওয়া এবং ঝড়ো বাতাসে যেন চারা ভেঙে না যায় সেজন্য খুঁটি দেওয়ার মতো প্রাথমিক যত্ন নিশ্চিত করতে হবে।
বৃক্ষরোপণকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা, সরকারি দিবস বা ছবি তোলার উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। একে একটি জাতীয় ও সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। দেশের প্রতিটি নাগরিক যদি এই বর্ষায় নিজ দায়িত্বে অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর এবং তা বাঁচিয়ে রাখার শপথ নেন, তবে খুব দ্রুতই আমরা একটি সবুজ, শীতল ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এটিই আমাদের সবচেয়ে সহজ ও সাশ্রয়ী হাতিয়ার। আসুন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আর এক মুহূর্ত দেরি না করে, এই বর্ষার প্রতিটি দিনকে কাজে লাগাই। আপনার পরম মমতায় লাগানো একটি চারা আজ হয়তো ছোট, কিন্তু আগামী দিনে তা-ই হয়ে উঠবে এই দেশের অমূল্য প্রাণশক্তি।
লেখক : সীমান্ত আরিফ: এমফিল গবেষক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্য করুন