প্রকাশিত: ১৭ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:১৮ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও বাড়তি ভর্তুকির চাপ সামাল দিতে আবাসিক খাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ বিভাগ ব্যবহারভেদে ৭.৮ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ২০.১১ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব তৈরি করেছে।
একই সঙ্গে পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তিনটি বিকল্প প্রস্তাবও করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ৫ হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে আপাতত প্রান্তিক গ্রাহকদের ওপর এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে না বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
দাম পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য গত ৯ এপ্রিল অর্থমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে সুপারিশ দেবে।
বর্তমানে আইন অনুযায়ী বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো প্রস্তাব দেওয়ার পর কমিশন যাচাই-বাছাই ও গণশুনানির মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের খুচরা দাম গড়ে ৮.৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়, ফলে প্রতি ইউনিটের গড় মূল্য দাঁড়ায় ৮ টাকা ৯৫ পয়সা। একই সময়ে পাইকারি দাম ৫.০৭ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এলএনজি, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে ভর্তুকির চাপও দ্রুত বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার কৃচ্ছ্রসাধন এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। উচ্চমূল্য সত্ত্বেও এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখা হয়েছে এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রাখতে সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে।
বর্তমানে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় পাইকারি বিদ্যুতের দাম কম থাকায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ঘাটতি প্রায় ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পাইকারি দামের প্রস্তাব অনুযায়ী:
খুচরা পর্যায়ে নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের সুরক্ষায় ০ থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য দাম অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব রয়েছে। তবে অন্যান্য আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে ৭০ পয়সা থেকে ১.৮০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও বিদ্যুতের দাম বাড়ছে। শ্রীলঙ্কা ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে বিদ্যুতের ট্যারিফ ইতোমধ্যে বৃদ্ধি করা হয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমাতে এবং দক্ষতা বাড়াতে তিন বছর মেয়াদি একটি রোডম্যাপ তৈরির পরামর্শ দিয়েছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করে ধাপে ধাপে মূল্য সমন্বয়ের সুপারিশও করা হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এলএনজি আমদানি ও জ্বালানি ভর্তুকিতে সরকারের ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে। মার্চ-এপ্রিলেই স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে অতিরিক্ত প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রতিদিন জ্বালানি তেলে গড়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
চলতি বাজেটে ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ ৪২ হাজার কোটি টাকা থাকলেও, জুন পর্যন্ত অতিরিক্ত প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
মন্তব্য করুন