প্রকাশিত: ১৯ ঘন্টা আগে, ০৯:১১ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
কেরানীগঞ্জে শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও একাধিক ছাত্রীর শ্লিলতাহানির অভিযোগ
স্টাফ রিপোর্টার:
রাজধানী ঢাকার কেরানীগঞ্জে ব্রাইট লাইট কিন্ডার গার্ডেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন খন্দকারের বিরুদ্ধে একাধিক ছাত্রীর সঙ্গে শ্লিলতা হানির অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ফলে ৪ মাসের অন্তঃসত্বা অবস্থায় আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনায় এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে স্কুলের ভেতর ওই শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে রাখে। খবর পেয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
গত রোববার এ ঘটনা ঘটে। এর পর স্কুলে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে এলাকাবাসী। শতাধিক ছাত্র-ছাত্রীর ক্লাস পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে।
বুধবার আমাদের সকাল এর প্রতিবেদক সরেজমিনে ওই স্কুলের সামনে গেলে ভুক্তভোগী কয়েকজন ছাত্রী ও অভিভাবক ছুটে আসেন।
জাহিদা নামের এক শিক্ষার্থী জানান, আমার বড় বোনের সাথে প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন খন্দকার বিভিন্ন সময় খারাপ আচরণ করেছে। আমাকেও বিভিন্ন সময় খারাপ প্রস্তাব দিয়েছে। রুমের দরজা বন্ধ করে ব্যাড টাচ করেছে।
নুপুর নামের সাবেক এক শিক্ষার্থীর মা জানান, ২০১৫ সালে আমার বড় মেয়ে নুপুর ও ছোট মেয়ে এই স্কুলে পড়ত। স্কুলের প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন বিভিন্ন সময় বড় মেয়েকে খারাপ প্রস্তাব দিত। ব্যাড টাচ করত। একদিন স্কুলের একটি কক্ষে নিয়ে তাকে ধর্ষণ করে। ঘটনার পর মেয়ে স্কুল থেকে কান্না করতে করতে বাসায় এসে সব খুলে বলে আমাকে। ওইদিনই আমার মেয়ে আত্মহত্যা করে মারা যায়।
মেয়েকে দাফন করার পর আমরা থানায় গিয়ে মামলা করতে চাইলে পুলিশ জানায় আপনারা মুচলেকা দিয়ে মরদেহ নিয়ে গেছেন। এখন মামলা করলে কবর থেকে মরদেহ তোলা হবে। পোস্ট মার্টেম করা হবে। তারপর মামলা হবে।
তখন আমাদের কাছে কোন প্রমাণ না থাকায় মামলা করিনি।
নুপুরের মা সাথে স্কুল ড্রেস ও তার ব্যবহার করা কয়েকটি খাতা নিয়ে আসেন। খাতার বিভিন্ন পাতায় জাকির হোসেন খন্দকারের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল এমন লেখা দেখা যায়।
ফাতেমা নামের এক শিক্ষার্থী জানান, নুপুরের সাথে প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তাকে ধর্ষণের ফলে ৪ মাসের অন্তঃসত্বা হয়ে যায়। এই ঘটনায় নুপুর নামের ওই শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে।
ভুক্তভুগী এক ছাত্রীর বাবা রোকন উদ্দিন বলেন, আমার দুই মেয়ে ওই স্কুলে পড়ত। গত রোজার ভেতর বড় মেয়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। কারণ জিজ্ঞেস করলে জানায় প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন আমাকে কু প্রস্তাব দিয়েছে। বিভিন্ন সময় শরীরের স্পর্শকাতর জায়গায় হাত দেয়ার চেষ্টা করে। খারাপ প্রস্তাব দেয়। মোবাইলেও খারাপ প্রস্তাব দেয়।
কয়েকদিন পর ছোট মেয়েও একই অভিযোগে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে। পরে তাদের সহপাঠি কয়েকজন বাসায় এসে বলে তোমরা স্কুলে যাও না কেন? আমার মেয়েরা বিষয়টি খুলে বললে ওই মেয়েরা জানায় আমাদের সাথেও স্যার এমন ঘটনা ঘটিয়েছে।
রোকন উদ্দিন বলেন, এই ঘটনার পর আমি এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিষয়টি জানায়। একই সঙ্গে আমার মেয়েসহ ভুক্তভোগি মেয়েদের নিয়ে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় অভিযোগ করতে যাই। থানা থেকে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা জানান যেহেতু শিক্ষা সম্পর্কিত বিষয়। আপনারা আগে উপজেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে যান। উনার পরামর্শের পর আমাদের কাছে আসেন।
তিনি বলেন, উপজেলা পরিষদে গেলে কয়েকজন ফোন করে জানান স্কুলের ভেতর প্রধান শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে রেখেছে এলাকাবাসীসহ ছাত্র-ছাত্রীরা। আপনি দ্রুত এখানে আসেন। তখন স্কুলে এসে আমি ৯৯৯ এ কল করি। এরপর কেরানীগঞ্জ মডেল থানা থেকে পুলিশ এসে অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়।
এই ঘটনার পর সাক্ষ্য দেওয়া ফাতেমা নামের এক ছাত্রীর ওপর অভিযুক্ত শিক্ষকের পরিবারের পক্ষ থেকে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। সাক্ষ্য দেয়া ওই ছাত্রী এবং প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন খন্দকার একই ভবনের বাসিন্দা। যে কারণে আদালতে সাক্ষ্য দিতে যেতে চায়নি। পরে কেরানীগঞ্জ মডেল থানা পুলিশ ওই শিক্ষার্থীকে নিরাপত্তা দিয়ে আদালতে নিয়ে জবানবন্দী নেয়।
যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত শিক্ষকের স্বজনরা। ওই শিক্ষকের বাসায় গেলে স্বজনরা জানান, আমরা কাউকে কোন ধরণের চাপ প্রয়োগ করিনি। বরং জাকির হোসেন খন্দকারের সঙ্গে শত্রুতা বশত মিথ্যা অভিযোগ করেছে ওই ছাত্রীরা।
সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে অতীতেও অনৈতিক আচরণের অভিযোগ ছিল। প্রায় আট দশ বছর আগে এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করায় ওই শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে।
এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা মোঃ মোশাররফ হোসেন বলেন, জরুরী সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে শ্লীলতাহানির অভিযোগ পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে যায়। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
এই ঘটনায় তদন্ত চলমান রয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ধর্ষণের অভিযোগে আগে এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে সেটা আমরা শুনেছি। কিন্তু কেউ থানায় লিখিত অভিযোগ করেনি। কেউ মামলা করলে আমরা ব্যবস্থা নেব।
মন্তব্য করুন