ওমর ফারুক

প্রকাশিত: ৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০২:২১ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট: সাক্ষ্য, আমানত ও জবাবদিহি

ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট: সাক্ষ্য, আমানত ও জবাবদিহি

ওমর ফারুক:
আগামী বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বহুল প্রত্যাশিত এই নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নিতে মুখিয়ে রয়েছে দেশবাসী। একজন দায়িত্বশীল নাগরিকের পাশাপাশি একজন সচেতন মুসলিম হিসেবেও ভোট দেওয়ার আগে ইসলামের দৃষ্টিতে এর গুরুত্ব ও দায়বদ্ধতা জানা জরুরি।

আধুনিক গবেষক ও আলেম সমাজের মতে, ইসলামে ভোট প্রদান কেবল একটি নাগরিক অধিকার নয়; বরং এটি কোরআন-সুন্নাহর আলোকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শরিয়তি দায়িত্বের সমন্বয়। তাদের বিশ্লেষণে ভোট প্রদান মূলত সাক্ষ্য, আমানতসহ ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার একটি বড় মাধ্যম।

ভোট মানে সাক্ষ্য প্রদান

ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট দেওয়া হলো শাহাদাত বা সাক্ষ্য প্রদান। অর্থাৎ একজন ভোটার যাকে ভোট দেন, তার যোগ্যতা ও উপযুক্ততার পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে তিনি এ মর্মে ঘোষণা দেন—তার দৃষ্টিতে সংশ্লিষ্ট পদের জন্য ওই ব্যক্তি সর্বাধিক যোগ্য।

কোরআন ও হাদিসে সাক্ষ্য প্রদানের বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। ন্যায় ও ইনসাফের সঙ্গে সাক্ষ্য দেওয়া ফরজ এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া হারাম। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, “যখন তোমরা কথা বলবে, তখন ন্যায়নীতি অবলম্বন করবে—সে ব্যক্তি নিকটাত্মীয় হলেও।” (সুরা আনআম: ১৫২)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “হে মুমিনগণ, আল্লাহর জন্য ন্যায় সাক্ষ্যদানে অবিচল থাকো।” (সুরা মায়িদা: ৮)।

আলেমদের মতে, যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে আত্মীয়তা, দলীয় পক্ষপাত, ব্যক্তিগত স্বার্থ বা বিরোধিতার কারণে কম যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া মিথ্যা সাক্ষ্যের শামিল। কোরআন ও হাদিসে মিথ্যা সাক্ষ্যকে কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মিথ্যা সাক্ষ্যকে সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহগুলোর একটি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন (বুখারি)।

ভোট একটি আমানত

ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে ভোট হলো একটি আমানত। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিনিধি নির্বাচনের যে অধিকার জনগণ পেয়েছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত আমানত। ভোট দেওয়ার অর্থ হলো—এই আমানত যথাযথ হকদারের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

আমানতের খেয়ানতকে ইসলাম স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করেছে। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, “যার মধ্যে আমানতদারি নেই, তার মধ্যে ঈমান নেই।” (বাইহাকি)। অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, “মুনাফেকের আলামত হলো—সে আমানতের খেয়ানত করে।” (বুখারি, মুসলিম)।

এ কারণে উপযুক্ত প্রার্থীকে ভোট দেওয়া মানে আমানত সঠিক স্থানে অর্পণ করা। আর যোগ্য ব্যক্তিকে পাশ কাটিয়ে অযোগ্য কাউকে ভোট দেওয়া আমানতের খেয়ানত হিসেবে গণ্য হয়। আলেমদের মতে, অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধার বিনিময়ে ভোট দিলে সেখানে একাধিক কবিরা গুনাহ সংঘটিত হয়—ঘুষ গ্রহণ ও মিথ্যা সাক্ষ্য উভয়ই।

দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তের আহ্বান

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ভোট দেওয়া নিছক ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়। বরং এটি জবাবদিহিমূলক একটি দায়িত্ব। তাই ‘আমার ভোট, যাকে খুশি তাকে দেব’—এই মানসিকতার পরিবর্তে সচেতনভাবে যোগ্য, সৎ ও দেশ পরিচালনায় সক্ষম ব্যক্তিকে নির্বাচনের আহ্বান জানাচ্ছেন আলেম সমাজ।

তাদের মতে, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী ভোট প্রদান করা প্রত্যেক মুসলমানের ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা যেন সবাইকে বুঝেশুনে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দান করেন—এই প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্তব্য করুন